ভাবুন তো, প্রায় ৭০০ বছর আগে এক মানুষ ছিলেন, যিনি দেশ-বিদেশ চষে বেড়িয়েছেন; পায়ে হেঁটে, উটে চড়ে কিংবা নৌকায়। যখন ইন্টারনেট কিংবা গুগল ম্যাপ দূরের কথা, যাতায়াত ব্যবস্থাই ছিল নড়বড়ে। জানা না থাকলে একটু অবাক হওয়ারই কথা। এই মানুষটি হলেন ইবনে বতুতা। তাঁর আসল নাম আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে বতুতা (১৩০৪-১৩৬৯)। মরক্কোয় জন্মগ্রহণ করা জগদ্বিখ্যাত এই পর্যটক প্রায় ত্রিশ বছর ধরে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়িয়েছেন। মূলত মুসলিম শাসকদের অধীন ভূখণ্ডগুলো সচক্ষে দেখে বেড়িয়েছেন তিনি। একুশ বছর বয়সে নিজ শহর তাঞ্জিয়ার থেকে বতুতা তাঁর ভ্রমণ শুরু করেন। এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, বাংলাপিডিয়া, জার্নাল অব আর্টসে প্রকাশিত ‘দোজখপুর টু জান্নাতাবাদ’ প্রবন্ধসহ ইন্টারনেটের বিভিন্ন সূত্র অবলম্বনে জীবনজয়ীর প্রতিবেদন।
জীবনের শেষপ্রান্তে এসে বতুতা লিখেছিলেন তাঁর অবিস্মরণীয় ভ্রমণবৃত্তান্ত—রিহলা। গবেষকরা হিসাব কষে দেখিয়েছেন, বতুতা সব মিলিয়ে তিয়াত্তর হাজার মাইল পথ ভ্রমণকালে অতিক্রম করেছিলেন। ভ্রমণের এক পর্যায়ে বাংলায়ও এসেছিলেন। তাঁর বাংলা সফর ছিল তুলনামূলকভাবে ছোট—দুই মাসের।
১৩৩৪ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লির সুলতান মুহম্মদ বিন তুগলক বতুতাকে ‘কাজী’ হিসেবে নিযুক্ত করেন। বতুতা প্রায় আট বছর এই পদে বহাল ছিলেন। এরপর ১৩৪৫ খ্রিষ্টাব্দে দক্ষিণ ভারতের কালিকটে যান। কালিকটের পরে বতুতার ঠিকানা হয় মালদ্বীপ। আরবি ভাষা জানার সুবাদে এখানে কিছুদিন বিচারকের কাজ করেন তিনি। বতুতার পরের গন্তব্য চীন। এই চীন দেশে যাওয়ার পথেই যাত্রাবিরতিতে তিনি বাংলায় আসেন ১৩৪৬ সালে।
বতুতার বাংলা প্রবেশ ঘটে জলপথে; সাদকাঁওয়ে (বর্তমান চট্টগ্রামে)। সাদকাঁওকে তিনি ‘সমুদ্রতীরবর্তী বিশাল নগরী’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। চট্টগ্রাম সফরের পর তিনি সোনারগাঁয়ে যান। সেখান থেকে একটি জাহাজে চড়ে জাভার (বর্তমান ইন্দোনেশিয়ার একটি দ্বীপ) দিকে যাত্রা করেন।
বাংলায় এসে বতুতা সুফি সাধক শেখ জালালউদ্দিনের (হজরত শাহজালাল) সুখ্যাতি শুনতে পান। এই সুফি সাধকের সান্নিধ্যে তিনি টানা তিন দিন কাটান। হজরত শাহজালালের প্রতি মুগ্ধতা ও তাঁর আতিথেয়তায় সন্তুষ্টির কথা বতুতা তাঁর লেখায় বারবার উল্লেখ করেছেন। এ বিষয়ে তিনি লিখেছেন, ‘যখন আমি তাঁর সামনে উপস্থিত হলাম, তিনি দাঁড়িয়ে আমাকে আলিঙ্গন করলেন। এরপর আমার দেশ ও ভ্রমণ সম্পর্কে জানতে চাইলেন।’
দুই মাসের সফরে বতুতা বাংলার প্রকৃতি, নদী, হাট-বাজার ও ধর্মীয় জীবনবোধ সম্পর্কে ধারণা পান। বতুতার ভাষায়, ‘আমরা দিন পনেরো নদীর দুপাশে সবুজ গ্রাম ও ফলফলাদির বাগানের মধ্যে দিয়ে নৌকায় পাল তুলে চলেছি, মনে হয়েছে যেন আমরা কোনো পণ্যসমৃদ্ধ বাজারের মধ্য দিয়ে চলছি।’
বাংলার রূপে মুগ্ধ হলেও এখানকার অদ্ভুত আবহাওয়া তাঁকে যথেষ্ট ভুগিয়েছিল। মেঘাচ্ছন্ন ও গুমোট আবহাওয়ার সঙ্গে জুলাই-আগস্ট মাসের তীব্র গরম বিদেশি পর্যটকের জন্য সুখকর ছিল না। হয়তো এ কারণেই কিছুটা খেদ নিয়ে বাংলাকে তিনি ‘দোজখ-ই-পুর-নিয়ামত’ বা ‘প্রাচুর্যপূর্ণ নরক’ বলে অভিহিত করেছিলেন। দোজখপুর বললেও বাংলার খাদ্যভাণ্ডার, কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ও জলপথের বাণিজ্য বতুতার দৃষ্টি এড়ায়নি।
বতুতার দেওয়া তথ্যমতে, বর্ষাকালে বাংলার নদীপথে যাতায়াতের জন্য ছোট ছোট নৌকা ব্যবহার করা হতো। সঙ্গে রাখা হতো ঢাকসদৃশ বাদ্যযন্ত্র, যা ছিল পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং জলদস্যুদের আক্রমণ থেকে রেহাই পাওয়ার এক অভিনব পদ্ধতি।
ইবনে বতুতা বাংলার অর্থনৈতিক অবস্থার পাশাপাশি রাজনৈতিক বিষয়েও আলোকপাত করেছিলেন। তাঁর সফরকালে পুরো বাংলা তিন শাসকের অধীনে ছিল। সুলতান ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ সোনারগাঁও, সুলতান আলাউদ্দিন আলী শাহ লখনৌতি এবং শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ সাতগাঁওভিত্তিক হয়ে বাংলার ভিন্ন ভিন্ন অংশ শাসন করতেন। বতুতার লেখাতে ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ ও সুলতান আলাউদ্দিন আলী শাহের মধ্যে বিরোধপূর্ণ সম্পর্কের ধারণা পাওয়া যায়। রিহলায় সুলতান ফখরুদ্দিন মুবারক শাহের নানামুখী প্রশংসা করেছেন বতুতা। তাঁকে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও সুফি সাধকদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
বাংলার সামাজিক বিষয়াবলিও বতুতার নজর এড়ায়নি। তাঁর লেখায় তৎকালীন বাংলায় সুফি-দরবেশদের প্রতি হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের শ্রদ্ধা ও নিবেদনের কথা পাওয়া যায়। তারা শেখ জালালউদ্দিনের খানকায় খাবার, অর্থসহ নানা ধরনের ভেট নিয়ে আসত। বতুতা জানান, এসব উপহার থেকেই সাধক-ফকিররা তাঁদের জীবিকা নির্বাহ করতেন। এমনকি তাঁদের কাছে যাতায়াত বাবদ কোনো অর্থও নেওয়া হতো না।
তখনকার বাংলার দাসপ্রথার কথাও উল্লেখ করেছেন বতুতা। খোলা বাজারে প্রকাশ্যে বিক্রি করা হতো দাস-দাসীদের। বতুতা নিজেও এক স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে আশুরা নামের এক দাসীকে ক্রয় করেছিলেন। গঙ্গা, যুন ও আন-নহর-উল-আয্রাক নামের নদীর কথা জানিয়েছেন তিনি। পরের দুই নাম দিয়ে সম্ভবত যমুনা ও সুরমা বোঝানো হয়েছে।
বতুতার লেখা থেকে বাংলার তৎকালীন অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কেও ধারণা পাই আমরা। খাদ্যভাণ্ডারের অপার বিস্তার ও স্বল্পমূল্য স্বয়ং বতুতাকে অবাক করেছিল।
অভিভূত হয়ে তিনি লিখেছেন, এত প্রাচুর্য এবং এমন কম দামের পণ্যের বাজার তিনি পৃথিবীর অন্য কোথাও খুঁজে পাননি। সে সময় বাংলার ব্যবসা-বাণিজ্যও ছিল চাঙা। দেশের অভ্যন্তরে নদীপথই ছিল ব্যবসার প্রধান সড়ক। নদীতে অসংখ্য পণ্যবাহী নৌকা চলাচল করত এবং নদীর দুই ধারে গড়ে উঠেছিল সরগরম ও বাণিজ্যিকভাবে সফল হাট-বাজার।
ইবনে বতুতা যখন বাংলা সফর করেছিলেন, তখন তিনি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও রাজনীতির পাশাপাশি বাজারের দিকেও বিশেষ নজর দিয়েছিলেন। তাঁর বর্ণনায় সে সময়ের ব্যবহৃত নানা পণ্যসামগ্রীর একটি চিত্তাকর্ষক মূল্যতালিকা পাওয়া যায়। তিনি পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করেছেন তখনকার প্রচলিত মুদ্রা, যেমন ‘দিনার’ ও ‘দিরহাম’-এর ভিত্তিতে। এ ছাড়া ওজনের হিসাব দেওয়ার জন্য তিনি দিল্লির ‘রতল’ নামক বিশেষ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করেছেন।
বতুতা বাংলাকে ‘দোজখপুর’ বললেও মোগল সম্রাট হুমায়ুন অবশ্য এই অঞ্চলকে ‘জান্নাতাবাদ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বাংলা নিয়ে বতুতার শক্ত শব্দ ব্যবহারের পেছনে প্রতিকূল আবহাওয়ায় ভোগান্তির বিষয়টি সম্ভবত বড়সড়ভাবে কাজ করেছে। ‘দোজখপুর’ বা ‘জান্নাতাবাদ’—যে নামেই ডাকুন না কেন, দুজনের বক্তব্যের মধ্যে একটি বিষয়ে মিল ছিল—সম্পদের অভাবনীয় প্রাচুর্য এবং জিনিসপত্রের কম মূল্য।
ইবনে বতুতার রচনায় আমরা বাংলার মানুষের জীবনযাত্রার এক অনন্য চিত্র পাই। তাঁর বক্তব্য সহজবোধ্য এবং অনুভূতির গভীরতায় সমৃদ্ধ, যা বাংলার প্রকৃতি ও মানুষের জীবনকে জীবন্তভাবে উপস্থাপন করে।